বাংলাদেশে ই-কমার্সের সমস্যা ও সম্ভাবনা

 

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে বলতেই হয়। সরকারের জোরালো পদক্ষেপের ফলে বিগত কয়েক বছরে ডিজিটাল বা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে ই-কমার্স বাংলাদেশে নতুন হলেও পিছিয়ে নেই। ক্রেতারা দিন দিন ই-কমার্সে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ফলে খুব দ্রুত এর বিস্তার ঘটছে। দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধি, বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটা ইতিবাচক দিক। দেশে এখন ই-কমার্স সরকারিভাবে অনুমোদিত হলেও এ খাতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনলাইনে কার্ডে পেমেন্ট ব্যবস্থা সহজতর হলে এবং যথাযথ নীতিমালার আওতায় ক্রেতা অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে এ খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে বলে অনেকের দৃঢ় বিশ্বাস।

সম্প্রত ইভ্যালি নামক একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ও মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে ই-কমার্স ব্যবসা ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত হচ্ছে। ইভ্যালির লোভনীয় অফারে আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ প্রি-অর্ডারের টাকা ফেরত নিয়েও শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে ই-কমার্স। অর্থাৎ ই-কমার্স হলো ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, যেমন ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করে ওয়েব ও ইলেকট্রনিক ডেটা আদান-প্রদানের মাধ্যমে সব ধরনের ভৌত এবং ডিজিটাল পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় করাকে বোঝায়। এটি মূলত অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনার একটি আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম, যা সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন, ব্যবসায়িক লেনদেন ও যোগাযোগ সহজীকরণ এবং সারা দেশে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থানের  সুযোগ সৃষ্টি করে।

ক্রমবিকাশমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার কারণে ই-কমার্সের মাধ্যমে কেনাকাটা করার জনপ্রিয়তা সারা বিশ্বেই দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘরে বসে মাত্র কয়েক ক্লিকের মাধ্যমে পণ্য কেনার মজাই আলাদা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন মানুষের চাহিদার পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি পরিবর্তন ঘটেছে বাজার চাহিদারও। বর্তমানে সরাসরি বাজারে না গিয়েই মানুষ অনলাইন মার্কেট থেকে পণ্য কিনছে। বাংলাদেশে যদিও এই অনলাইন থেকে পণ্য ক্রয় করার বিষয়টি এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি, তবে পুরোপুরি সচল হতে খুব বেশি দিন লাগবে না বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা এই সেবা চালু করেছে এবং নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান চাহিদার তুলনায় বেশ কম।

ইলেকট্রনিক প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে দেশে ২০০৬ সালে পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয় বেসরকারিভাবে শুরু হয়। তখন অনলাইন বাণিজ্যের সরকারি অনুমোদন ছিল না। প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে সরকার ব্যাংক ই-কমার্স বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে পুরোপুরিভাবে চালু হয় ই-কমার্স। এ খাতকে তখন থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

লক্ষ করলে দেখা যাবে এই ব্যবসায় তরুণ উদ্যোক্তাই বেশি। তরুণ উদ্যোক্তা বেশি হওয়ার কারণ এই ব্যবসায় বিনিয়োগ কম এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কম সময়ে বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে একটা ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করতে খুব বেশি অর্থও লাগে না। কারণ বর্তমানে অনেক কম খরচে একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা অনেক কম খরচে ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করে থাকে। তাই খরচ ও সময় কম ব্যয় হওয়ায় এই ব্যবসার জন্য অনেকেই এখন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

ই-কমার্স ব্যবসার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। কারণ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আমাদের অবশ্যই কোনো না কোনো সময় এটার দ্বারস্থ হতে হবে। যদি ভবিষ্যতে এটির দ্বারস্থ হতেই হয়, তাহলে ই-কমার্স শুরু করতে দেরি কেন। একটা প্রতিষ্ঠান ভালো একটা স্থানে দাঁড় করাতে হলে সেটির প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া উত্তম। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব পণ্যই এখন অনলাইনের মাধ্যমে ক্রয় করা সম্ভব। অনলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন অনেক পরিমাণে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। যাই হোক সব বিষয় বিবেচনা করে এটা বলা যেতেই পারে, এটির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

যে কোনো কাজে সাফল্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই ভালো পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ পরিকল্পনা ছাড়া কাজ করলে কাজে সফলতা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে ভালো মানের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা ই-কমার্সের প্রথম পদক্ষেপ ও শর্ত। কারণ ওয়েবসাইট যদি ভালো মানের না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও ওয়েবসাইট তৈরি করা লাগতে পারে। তাই প্রথমেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ করতে হবে। এতে সময় ও অর্থ উভয় বাঁচবে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আঙ্কটাড ১৩০টি দেশের ই-কমার্স খাত নিয়ে একটি নিরীক্ষা করে। তাতে দেখা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা একটি দেশের ই-কমার্স খাতের অবস্থান নির্ণয়ের প্রধান সূচক হিসেবে কাজ করে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বৃদ্ধির হার ১৪ শতাংশ, তবে বিটিআরসি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী এ হার ৩৯ শতাংশ। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে, দেশে ই-কমার্সের কর্মকাণ্ড দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি মাসে নতুন নতুন সাইটের আগমন ঘটছে। যদিও এ খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে খুব একটা গবেষণা পরিচালিত হয়নি। তবে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত ধীরে ধীরে উন্নতি করছে এবং এ খাতে লেনদেন প্রতিবছর কমপক্ষে ১০ শতাংশ  বৃদ্ধি পাবে।

তবে ই-কমার্সের সংগঠন ই-ক্যাবের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ই-কমার্স বাড়ছে খুবই দ্রুত গতিতে। তিন বছর ধরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে এ খাত। বাংলাদেশে ই-কমার্সের এক নম্বর জায়গাটি চীনের আলিবাবার দখলে। বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনও।

আমাদের দেশে ই-কমার্সের ক্রেতারা  মূলত শহরকেন্দ্রিক। তার মধ্যে ৮০ শতাংশ ক্রেতা ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের এবং তাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ঢাকার, ৩৯ শতাংশ চট্টগ্রামের এবং ১৫ শতাংশ গাজীপুরের অধিবাসী। অন্য দুটি শহর হলো ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ এবং আরেকটি মেট্রোপলিটান শহর সিলেট। ৭৫ শতাংশ ই-কমার্স ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ৩৪-এর মধ্যে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার উদ্যোক্তা ফেসবুক পেজে ব্যবসা করছেন। তাদের মধ্যে ২০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা সক্রিয়। সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্সের বাজার দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা চলতি বছর বেড়ে দুই হাজার ৭৭ মিলিয়ন ডলার হবে এবং আগামী ২০২৩ সালে বাজারের আকার হবে তিন হাজার ৭৭ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্রায় সাত হাজার ৫০০ প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সারা দেশে যেহেতু ই-কমার্স এখনও পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাই না চাইলেও কেনাকাটা করতে বাধ্য হয়ে ক্রেতাদের বাজারমুখী হতে হচ্ছে। তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিল পরিশোধের ব্যাপার পুরোপুরিভাবে অনলাইনভিত্তিক হয়ে গেছে। যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাসের বিল, সারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের চাকরির বেতন প্রভৃতি পরিশোধ করা যাচ্ছে সম্পূর্ণ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এতে মানুষের ভোগান্তি পোহাতে এবং সেইসঙ্গে মূল্যবান সময়ও নষ্ট হচ্ছে না। তাই অনেকেই ই-কমার্সের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

উন্নত দেশগুলোর সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছে ই-কমার্স। তবে বাংলাদেশে ই-কমার্সের সম্ভাবনা কতটাÑতেমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করলেও প্রকৃত বাস্তবতা হলো, এদেশে ই-কমার্সের সম্ভাবনা অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত। আর তাতে নতুন মাত্রা আনয়ন করছে করোনাভাইরাস। এই ভাইরাস যে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে খুব খারাপ একটা প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বা ফেলে দিয়েছে, এ বিষয়ে আমরা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছি।

বর্তমানে দেশে যে ই-কমার্স সাইটগুলো রয়েছে, সেগুলোর সবই বিশ্বস্ত নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান সঠিক পণ্য, সঠিক সময়ে সরবরাহ, সঠিক দাম নিশ্চিত করে না; ফলে ক্রেতারা প্রতারিত ও বিড়ম্বিত হয়। এর জন্য ই-কমার্স ব্যবসার একটি নীতিমালা প্রণয়ন এবং এর আলোকে বিধিবিধান কার্যকর করা জরুরি। এর ফলে ক্রেতারা অনলাইন শপিংয়ে ভরসা পাবে। অন্যদিকে সমস্যা রয়েছে পেমেন্ট সিস্টেম নিয়েও। বাংলাদেশে ই-কমার্সে লেনদেনের সিংহভাগ এখনও ক্যাশ অন ডেলিভারি প্রক্রিয়াতে হয়ে থাকে। কার্ডে লেনদেন এখনও অনেক কম। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পূর্ণভাবে পেমেন্ট সুইচ চালু করতে পারেনি। আরও অভিযোগ রয়েছে, পেমেন্ট গেটওয়ে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চহারে চার্জ করে। এই বিষয়গুলোর যত দ্রুত সমাধান করা যাবে, ততই আমরা ই-কমার্সের পরিপূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারব।

লেখক-
মো. জিল্লুর রহমান
ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক

মূল পোস্ট দেখতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0
    0
    Your Bag
    Your cart is emptyReturn to Shop
    Scroll to Top